হাসান তানভীর এর MOTO-TRAVEL ব্লগ

Its better to travel well, then to arrive – Buddha

নিঝুম দ্বীপ ও মনপুরা ভ্রমন

Dup(01)IMG_20140615_092717

নিঝুম দ্বীপ ও মনপুরা ভ্রমন

১৪/০৬/২০১৪ – শনিবার

ছবির মত ২ টি দ্বীপ এ এবার টুর দিয়ে কয়েকটা দিন কাটিয়ে এলাম। নিঝুম দ্বীপ ও মনপুরা! এত সুন্দর! তব্দা মেরে গিয়েছিলাম তাদের মোহনীয় রুপে।  প্রকৃতি অকৃত্তিম ভাবে সেজে আছে এখানে। বারে বারে ঘুরে ফিরে নানা ভাবে সে তার রুপ দিয়ে পাগল করেছে। জানি না, কিভাবে এই বর্ননা দেবো।

শুরু করি তবে…..

হরিণ দেখার ইচ্ছে ছিলো অনেকদিন থেকেই। আর কয়েকদিন থেকেই মন উড়ু উড়ু। জাকির ভাই কে প্রস্তাব দিলাম– চলেন যাই নিঝুম দ্বীপ। তিনি রাজি। পরদিনই ৭.৩০ এ ওনার বাসায় চলে গেলাম। চা টা খেয়ে রওনা দিলাম সাড়ে ৮ টার দিকেপ্রথমে নোয়াখালির সোনাপুর গিয়ে বিরতি দিয়ে খাওয়াদাওয়া সেরে নিলাম। তারপর  চেয়ারম্যান ঘাট পৌঁছেছি, তখন দুপুর। হায়, জানলাম হাতিয়ার উদ্দেশ্য ট্রলার ছাড়বে সেই বিকেলে; ৫ টার দিকে – জোয়ার আসলে। রিজার্ভ স্পীড বোট নেয়া যায় – ৬ জন-৩০০০ টাকা।

তবে এখন নদির অবস্থা নাকি উথাল পাথাল। সিগন্যাল ও ছিলো। ঠিক করলাম, ট্রলার এ যাবো। প্রথমে খাওয়া দাওয়া সেরে নামাজ পড়ে নিয়ে হোটেলে দুজন অপেক্ষা করে করে ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম। যাক, এক সময় ট্রলার ছাড়লো। নদির বড় বড় ঢেউ আছড়ে পড়ছিলো ট্রলারে। দেড় ঘণ্টার ভেতর পৌঁছে গেলাম হাতিয়া। ভাড়া নিয়েছিলো ১৫০ করে। যখন পোউছালাম তখন সাড়ে ছটা। শুনলাম এখানে থেকে ৬০/৭০ কিলো স্থল পথে গিয়ে আরো একটা নদি পার হতে হবে। নৌকার শেষ ট্রিপ – ৮ টায়। হাতে দেড় ঘন্টা সময়। আমরা বাইক ভাড়া করলাম। এখানে রোড গুলোতে প্রচুর বাইক আছে – ভাড়া নেয়া যায়। আমি তো মহাখুশি। ৫০০ টাকা দিয়ে বাইক ঠিক করে জাকির ভাই ও বাইক ওয়ালা কে পিছনে বসিয়ে দিলাম টান। সময় বেশি নেই। উড়ে জেতে হবে।

নাহলে আজ আর নিঝুপ দ্বীপ পোউছানো যাবে না। টানতে লাগলাম তুফান বেগে। অবশেষে পারলাম ৮ টায় পৌছাতে। জায়গার নাম – “নামার বাজার”। এছাড়া নিঝুপ দ্বীপ জাওয়ার অন্য একটি ঘাট আছে জার নাম বন্দরটিলা। যাই হোক,  ঘাটে শেষ ট্রিপ পেয়ে গেলাম। হাটু পরিমান কাদা। জুতা খুলে নিলাম। যদিও নৌকার ভাড়া ৫ টাকা – এবং মাত্র ১০ মিনিট লাগলো অন্য পাড়ে পৌছাতে। নৌকাতে জাকির ভাই উলটে পড়ে নখে বেথা পেলেন।

IMG_20140616_085741

নিঝুম দ্বীপ পোউছালাম। তবে পথ আরো বাকি।  আবার বাইক ভাড়া করলাম- ১৫০ টাকা। ১৫ কিলো পথ অন্ধকারে চললেও বুঝতে পারছিলাম নিঝুম দ্বীপ সেজে আছে অন্য সাজে। রাতের অন্ধকারে যে পথে চলছিলাম বাইকে করে – হরিণ প্রায় ই নাকি রাস্তা পার হয়। মাঝে মাঝে বাইকে এক্সিডেন্ট ও করে। যাই হোক, পৌঁছে প্রথমে গেলাম নিঝুম রিসোর্ট (অবকাশ হোটেল নামে সবাই চেনে) ওখানে অমায়িক নিতিবান মানুশ সবুজ ভাই (ম্যানেজার) আমাদের রুম ঠিক করে দিলেন। ১০০০ টাকা ভাড়া – আমি ৮০০ দিয়ে নিলাম। জেনারেটর দিয়ে ইলেক্ট্রিসিটি থাকবে রাত ১২ টা পর্যন্ত। আতকে উঠলাম আলো এবং বিশেষ করে ফ্যান ছাড়া থাকতে হবে ভেবে।

অন্য একটা গ্রুপ২ রুম নিয়ে ছিলো। তাদের সাথে রফা করে নিলাম।সারারাত জেনারেটর চলবে, ভাড়া সবাই মিলে দিবো। রাতে সবুজ ভাই নিয়ে গেলেন আলতাফ ভাই এর হোটেলে। দ্বীপ এ থাকাকালীন সময়ে এই হোটেলেই খেয়েছি প্রতিবার। কারন প্রথম বার খেয়েই মাথা নস্ট হয়ে গেলো। অনেক রকম মাছ ভাজি ও মাছের আইটেম থাকতো প্রতি বেলা। চিংড়ি মাছ থেকে শুরু করে নাম না জানা অনেক মাছ।

অসাধারন স্বাদ এই সব টাটকা মাছগুলোর। আর আলতাফ ভাই নিজের বাসা থেকে রান্না করে হোটেলে নিয়ে আসতেন আমাদের জন্য। অনেক খাতির করলেন। সাথে ছিলো দুধে মাখানো পায়েস আর মহিষের দই। আর প্রতিবেলায় নিত্য নতুন মাছের আইটেম করতেন তিনি। ২ দিন ছিলাম আমরা। ইচ্ছে মতো খেয়েছি আমরা। বলে রাখা ভাল – খরচ ও কম। এত আইটেম ১০০ টাকায় হয়ে যেতো এক জনের।

IMG_20140615_111212

খেয়ে কিছুক্ষণ গল্প করলাম ওই গ্রুপ টির সাথে। তারা বেশ ভ্রমন বাজ। কিছুদিন আগে নাফাকুম ঘুরে এসেছে। তাই জমল বেশ।

ক্লান্ত ছিলাম।  রাতে তাই ঘুমিয়ে পড়লাম।

১৫/০৬/২০১৪ – রবিবার

শুনলাম হরিণ দেখার সময় বিকেলের পর। যখন জোয়ারের পানি নেমে যায়। তখন জঙ্গলের ধারে তীরের কাছে আসে হরিণ রা। তবে একটা জায়গায় নাকি সকাল বেলায় ও দেখা যায়। তাই ঠিক করলাম সকালেও দেখবো। সকাল ৭ টায় উঠে নাস্তা করে বাইক ভাড়া নিলাম দুপুর ১২ টা পর্যন্ত। চলে গেলাম “চোয়া খালি”। আমিই বাইক চালালাম যথারীতি। সকালের ম্রদু ঝিরিঝিরি বৃষ্টি তে আবহাওয়া ছিলো অসাধারন। এই আবহাওয়াতে নিঝুম দ্বীপ এর রুপ দেখতে দেখতে বাইক চালাতে লাগলাম।

IMG_20140616_160550

IMG_20140616_161043

IMG_20140616_160428

এত সুন্দর। নিঝুম দিপের প্রথান রাস্তাটি মসৃণ। ২ পাশ জুড়েই ম্যানগ্রোভ এর মত এক ধরনের কেওড়া গাছ। যার শেকড়ের দিক টা পানির ভেতর তলিয়ে থাকে। দেখতে অসাধারন লাগে।

2

DSC04898

চোয়াখালি পৌঁছে বাইক রেখে একটা পথ ধরে কিছুদুর পার হয়ে নৌকার সহায়তায় খাল পার হয়ে জঙ্গলে ঢুকে পড়লাম। এই বিশাল জংগলেই হরিনের পাল ঘুরে বেড়ায়।

3

প্রায় ৫০ হাজারের মত হরিণ আছে এখানে। কিছুদিন আগে নাকি “হরিণ বন্যা” হয়। অর্থাৎ হরিণ মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি পেয়ে যায় যে, তাদের খাওয়ার অভাব হয়ে যায়। তখন নাকি কিছু শেয়াল ছেড়ে হয় হরিণ খেয়ে কমানোর জন্য। অথচ কোন মানুষ হরিণ মারলে কঠিন আইন। মামলা হয়ে যাবে।

হরিণরা শব্দ শুনলে চলে যায়। তাই ঠিক হলো আমি এক দিয়ে ঢুকবো, আর জাকির ভাই অন্য দিক দিয়ে। অনার সাথে গাইড (বাইক যার থেকে নিয়েছি) থাকবে। ঢুকে পড়লাম। অসাধারন সেই অভিজ্ঞতা। জঙ্গলের গাছ গুলোর শিকড় গুলো চোখা হয়ে থাকে। যদি ও পা কাটে না। মানে ভোতা মাথা। তবে প্রচুর। তাই একবার সামনে হরিণ আছে কিনা দেখতে হবে, আবার মাথা নিচু করে খুব সমর্পণে শব্দ না হয় মত পা ফেলে আগাতে হয়।

IMG_20140615_082629

IMG_20140615_172304

vlcsnap-2014-06-18-12h42m47s129

এখন যেহেতু জোয়ার নেই খুব হাল্কা পানি গাছের গোড়ার কাছে। জোয়ার এলে পানিতে ডুবে যাবে। কিছুদুর আগাতেই প্রথম হরিনের পাল দেখলাম। এই অভিজ্ঞতা অসাধারন।

মুগ্ধ হয়ে দেখে ছবি তুলতে যাওয়া মাত্র মাথা উচিয়ে দেখে লাফ দিয়ে পুরা দলটি পালিয়ে গেলো।এমনই চলল। আমি নেশায় অনেক দুর ঢুকে গিয়েছিলাম।

এদিকে ৯ টা বাজাতে জোয়ারের পানি আসা শুরে হয়েছে। আমি ফিরতে শুরু করলাম। কিন্তু সমস্যা দেখা দিলো। এতক্ষণ সহজে এসেছি। কিন্তু  এখন পানি উচু হয়ে এক বিঘৎ হয়ে গেছে। আরো বাড়তে লাগলো পানি। একটা পর্যায়ে আমি ভয় পেয়ে গেলাম। পানি হয়ে গেছে ২ বিঘৎ। হাটতে কস্ট হচ্ছে। অনেক দুর হেটেও তীর অর্থাৎ খালের দেখা পাচ্ছি না।

পানি আরো বেড়ে গেলে আমাকে গাছে উঠে যেতে হবে। আর আমাকে খুজে পাওয়াও অনেক কঠিন হবে এই ঘন জঙ্গলে। পানি আর শ্বাসমূল দেখে দেখে আগাতে লাগলাম দ্রুত। এক সময় হর্ন শুনতে পেলাম। বাচা গেলো। অবশেষে খাল টি খুজে পেলাম। ব্যাগটি ছুড়ে মারলাম অন্য পাড়ে। সাতার দিয়ে পার হব ভেবে। কিন্ত না। পানি কোমর সমান। এর পর কিছুদুর পথ হেটে একসময় সেই দোকানে এসে রঙ চা খেতে লাগলো। বৃষ্টি হচ্ছিলো ঝিরিঝিরি। আরো আধাঘণ্টা পর জাকির ভাই রা এলেন। ওনারা দেরি দেখে আমাকে খুজতে গিয়েছিলেন। গাইড ভয় পেয়েছিলো যে আমি হারিয়ে গেছি।

জাকির ভাই এর কাহিনি হল, ওনাকে নাকি হরিণরা দাবড়ানি দিয়েছে তাদের ডিস্টার্ব করার কারনে।:D  পরে উনি রেগেমেগে হরিণ দের ধাওয়া দিলেন ছবি তোলা বাদ দিয়ে। ধাওয়া-পালটা ধাওয়া চলল। আমি পরামর্শ দিলাম “রেগে গেলেন, তো হেরে গেলেন”। না রেগে গেলে ঠান্ডা মাথায় ছবি তুলতে পারতেন।

এরপর সোজা টান দিলাম দক্ষিন দিকের সাগর পাড়ে। প্রচুর লাল কাকড়া আছে।

IMG_20140615_100620DSC04921

IMG_20140615_103637

IMG_20140615_094726

ওখানে বেশ কিছুক্ষণ সময় কাটালাম। ওয়েদার টা জোশ। তাই আমাদের স্পিরিট ভরপুর। ওখান থেকে ফিরে গেলাম পশ্চিম দিকের সাগর পাড়ে। যাওয়ার পথে স্থানীয় দের সাথে কথা বলে ডাব পাড়ার বেবস্থা করে গেলাম। কক্স বাজার – কুয়াকাটার মত এখানে ডাব বিকি কিনির বেবস্থা নেই। স্থানীয় দের কাউকে বললে সে তার গাছ থেকে পেড়ে দেয়ার বেবস্থা করে দেয়।  যাওয়ার পথে মন- কাড়া সব দ্রশ্যাবলি।

DSC04913

দুরে দুরে মেঘনা নদীর উপর জেগে ওঠা ছোট ছোট চর। রাজ হাস আর হাসের পালের বাচ্চা সহ ঘুরে বেড়ানো –দিগন্তের সাথে মিলে যাওয়া খোলা প্রান্তর ভরা গুরুর পাল। ফিরে এসে ডাব খেয়ে দারুন লাগলো। ভীষণ মিস্টি পানি।

DSC04938

DSC04940

যাক, ফিরে এসে ফ্রেশ হয়ে দুপুরে খেলাম। জাকির ভাই বললেন, চলেন হরিণ তো দেখা হল। মোটামুটি ঘোরা হল। এবার ফেরা যাক। আমি ঝিম মেরে গেলাম।  ২ মিনিট চুপ  করে থেকে বললাম “ আমার একটা প্ল্যান আছে” বলে বারবিকিউ সহ আরো নানা রকম কিছুর কথা মিশিয়ে লোভনীয় এক গল্প ওনাকে শোনালাম। শুনে তিনি রাজী থাকার জন্য। আমি সস্তির নিশ্বাস ফেললাম। মাত্র আসলাম। এখনি কিসের যাওয়া।

ওখানে এক গাইড জোগাড় করে ফেললাম – নৌকা করে যাবো “চৌধুরী খাল”। ওখানে সবচে বেশি নাকি হরিণ দেখা যায়। ঠিক কাটায় কাটায় ৪ টায় যাবো। আসলে এত আগে গিয়ে লাভ নেই। কারন হরিন আসে সন্ধ্যার দিকে।

বের হতে হতে সাড়ে চারটা প্রায়। নৌকা করে রওনা দিলাম। সত্যি। মন কাড়া পাগল পারা দ্রশ্য গুলো আমাদের অভ্যর্থনা করলো। খালের ২ পাশ জুড়ে গাড় সুবুজ গাছের জঙ্গল। প্রচুর পাখি – গাড় সবুজের এক মেলা। আমরা এগিয়ে গেলাম।

IMG_20140615_163653

এক সময় জঙ্গলের এক পাশে নৌকা রেখে মাঝিদের পাঠালাম কিছু খাবার দাবার আনতে। আর আমরা গাইড সহ জঙ্গলে ঢকে পড়লাম। হরিণ যদিও দেখা যাবে আরো পরে। জংগলের ভেতর দিকে ঢুকে অনেক ছবি তোলা হল। আমরা অন্য প্রান্তর দিয়ে বের হলাম।

IMG_20140615_170102

খোলা দিগন্তের শেষ মাথায় সাগর মিশেছে। সব কিছু ছবির মত সুন্দর। কোন বিখ্যাত শিল্পী যেন অনেক যত্ন করে একেছে। জাকির ভাই সমানে ফটোসেশন করতে লাগলেন মাঠের ওপর।

IMG_20140615_174623

যখন বিকেল পড়ে এসেছে, আমি একা একা কোন ফাকে যেন জঙ্গলে ঢুকে পড়লাম খালী পায়ে। একটু দুর যেতেই চোখে পড়ে গেলো হরিনের পাল। পিছু নিলাম। সত্যি বলতে নিজেকে মনে হচ্ছিলো বিয়ার গ্রিলস। আগের অভিজ্ঞতা (সকালে চোয়াখালি)  থাকাতে এবার নিঃশব্দ ভাবে হাটতে পারছিলাম।

মাথা ঝুকে ঝোপের ফাকে ফাকে বা গাছের আড়াল নিয়ে এগোতে লাগলাম। এবার দেখলাম শেয়াল। সেই শেয়াল পিছু নিয়েছে এক হরিনের পালের। আমি অন্য দিক দিক দিয়ে ঘুরে প্রায় মুখোমুখি পড়ে গেলাম সেই হরিনের পালের। সাথে সাথে স্ট্যাচু হয়ে গেলাম। কয়েকটা হরিণ অপলক তাকিয়ে রইলো।

3

এখনো বুঝে ওঠেনি। ১ মিনিট এর মত কাটলো। এত কাছে হরিণ। ছবি নিতে হবে। আস্তে আস্তে ক্যামেরা ওঠাতে শুরু করলাম। হটাৎ একটা হরিণ বিকট শব্দে ডেকে ঊঠলো “কাউ” “কাউ” – আর লাফ দিয়ে উঠে পালাতে লাগলো। এই প্রথম শুনলাম হরিনের ডাক। এরপর দারুন এডভেঞ্ছারাস কিছু সময় কাটালাম এই জঙ্গলে।

ভিডিওঃ https://www.youtube.com/watch?v=QXTk0uSGEzs

অনেক গুলো হরিনের পালের সাথে “মোলাকাত” হলো। দেখলাম, তারা এক জন অন্য জন সতর্ক করে দেয়। তখন অন্য জায়গা থেকেও ডাক শোনা যায়। জঙ্গলে এসেছে অতিথি। ALERT ALERT।

অনেক জায়গায় বেশ ঘন জঙ্গল। পথ নেই। কস্ট করে পথ বের করে এগোতে হয়েছে। বেশ দক্ষ হয়ে উঠেছিলাম। কারন সেই গাছের শিকড় গুলো বেস ঘন আকারেই আছে। পা সাবধানেই ফেলতে হয়। ওগুলোতে পা পড়লো পা যদি ও বা না কাটে, তবে “মট” করে শব্দ হলে, হরিণ পালিয়ে যায়। এই প্রথম বার ভাল একটা ক্যামেরার ভীষণ প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলাম।

যাক, কিছু ছবি ও ভিডিও করলাম। এক সময় ফিরে এলাম। নৌকায় ফিরে দেখি জাকির ভাই শুয়ে আছে। তিনি আসলে হরিণ দেখার সময় আসার আগেই জঙ্গলে এবং মাঠে ঘোরা ঘুরি করে ফেলেছেন।

আমরা রওনা দিলাম হেটে। কারন নৌকা জোয়ারের পানির টানে এসেছে। এখানে পানির বিপরীতে নৌকা নিতে ভীষণ কস্ট হবে মাঝির।

নীচের ছবিতে দেখুন। নৌকা টেনে টেনে নেয়া হচ্ছে জোয়ারের পানির বিপরীতে।

IMG_20140615_175903

আবার নৌকা করে যেতে চাইলে নেক্স্ট জোয়ারের সময়, অর্থাৎ রাত ১০ টায় যেতে হবে। তাই আকাশের ঝিলমিল করতে থাকা তারা গুলোর নিচ দিয়ে, সৈকতের পাশ ধরে বালু মাড়িয়ে আমরা আধ ঘন্টা হেটে ফিরলাম।

হোটেলে ফিরে ফ্রেশ হয়ে রাতে আবার আলতাফ হোটেলে। তিনি প্রচুর চিংড়ি দিলেন খেতে। সাথে অন্য মাছ ভাজিও ছিল। শেষ দিন। আমরা বলে রেখেছিলাম। দুপুরে ইলিশ দিয়েছিলেন।

IMG_20140615_212623

রাতে সবুজ ভাই (ম্যানেজার) এর অনেক্ষন কথা বললাম আমি। জাকির ভাই ঘমিয়ে পড়েছেন। এক সময় আমার ও চোখ মুদে এলো।

ও হে। ওই দল চলে গিয়ে ঢাকা ভার্সিটির আরেক দল ছিলো। বেচারারা টাকার টানা টানিতে পড়ে গিয়েছিলো। তারা জেনারেটর এর জন্য খরচ করতে রাজী না।  সারা দিনের জন্য বাইক ভাড়া করেছিলো না বুঝে – জেটা আসলে দরকার ছিলো না। আমরা বাইক ওয়ালা কে দিয়েছিলাম ৪০০ টাকা। তাদের বুঝিয়ে সুজিয়ে…

মনপুরা ভ্রমন 

১৬/০৬/২০১৪ – সোমবার

সকালে আমাদের রওনা হওয়ার দিন। কিন্তু আমার মাথায় ভুত চাপলো “মনপুরা” যাবো। এটাও একটা দ্বীপ। মন পুরা ছবির সেই “মন পুরা”। প্ল্যান বদলে নিলাম। যাবো মনপুরা। জাকির ভাইকে বলে রাজি করিয়ে ফেললাম।  সকালে নাস্তা করে রওনা দিলাম বাইক নিয়ে। ১৫০ টাকা।  ঘাটে নামিয়ে দিলো। আবার নদি পার হলাম নৌকা দিয়ে। ওখান থেকে যাবে তম্রুদি। সেখান থেকে লঞ্চ ধরবো।  কিন্তু হায়। দেখি কি এক ধর্ম ঘট। বাইক যেতে দিচ্ছে না। মন খারাপ। আবারো আল্লাহ সাহায্য করলেন। আমরা ভিনদেশি বলে একটা বাইক কে বলে দিলেন আমাদের নিয়ে যাওয়ার জন্য। আলহামদুলিল্লাহ। চড়ে বসলাম। প্রায় ৫০ কিলো পথ। যথারীতি আমিই চালালাম। দারুন এই পথ। ২ পাশে ঘন গাছের ছায়া।

5

বেশ লাগলো। মাঝ খানে বিরতি দিয়ে নাস্তা করলাম আর বিকাশ থেকে টাকা তুললাম। ২ জনের টাকা প্রায় শেষ। আর এখানে যাতায়াতে (স্থল ও নৌ-পথ) ২ পথেই বেশ খরুচে।

তমরুদ্দি পৌঁছেছি বেলা ১১ টায়। লঞ্চ ছাড়লো ২ টায়। সময় টা কাটলো ঘুরে ফিরে।

IMG_20140616_114232

IMG_20140616_135147

এক সময় পৌঁছে গেলাম মন পুরা। দেড় ঘন্টা লাগলো। লঞ্চ থেকেই দেখলাম সাজানো একটি দ্বীপ – সপ্নের একটি টুকরোর মত মনে হল। নেমেই বাইক ভাড়া করে চলে গেলাম “নাজির হাট”। এখানে ডাক বাংলো তে থাকবো। আসার পথে মুগ্ধ হয়ে গেলাম এখানের কার্পেট এর মত রাস্তা আর

ছবির মত দুর দুরের দৃশ্য, রাস্তার ২ পাশে পানির ওপর শেকড় ডুবানো গাছ গুলো দেখে। বাংলো তো এসে রুম ঠীক করে বের হয়ে পুকুরে গোসল সেরে নিলাম (বাংলো তে পানি নেই। তবে ভালোই হয়েছে)

IMG_20140617_081653

IMG_20140617_082137

আসার পথেই হোটেলে খাওয়া সেরে নিয়েছিলাম। পরে ফ্রেশ হয়ে, রেস্ট নিয়ে ২ জন বের হলাম। বাইক আমরা রেখে দিয়েছিলাম। রওনা দিলাম। কিছু দুর যেতেই মনে হলো আমরা কোন সপ্নের দেশের নায়ক – ছুটে যাচ্ছি রাজ কন্যা উদ্ধারে।

গন্তব্য আলম বাজার। প্রায় ১০ কিলো নাজির হাট থেকে। ওখানেই হরিন দেখতে পাওয়া যাবে। তবে ভুল করে আমরা আরো অনেক দুর চলে গিয়েছিলাম। তার জন্য আফসোস তো নেই ই, বরং ভালই হয়েছিলো।

চার পাশের দ্রশ্য গুলো মাথা ৩৬০ ডিগ্রী এঙ্গেলে নস্ট হতে লাগলো। একি দেখছি আমরা। এত সুন্দর কোন দ্বীপ হতে পারে? ছবিও তো এত সুন্দর না।

এ কোথায় এসে পড়লাম আমরা? নৈসর্গিক দৃশ্য গুলো আমাদের হৃদয় ধরে ঝাকাতে লাগলো। আমরা আপ্লুত হতে দেখতে লাগলাম আর প্রান ভরে এই সউন্দদরজ শুধা পান করতে লাগলাম। আমার ধারনা “মনপুরা” বাংলাদেশের শুধু যে সবচে সুন্দর দ্বীপ তা নয়, অন্যতম সুন্দর জায়গাও। আমাদের মন কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে গেলো। বিকেলের আলোতে ফটো সেশন চলাকালিন সময় জাকির ভাই জ্ঞেন দিলেন – কনে দেখা আলোতে ছবি তুলতে কি হয়, না হয়।

IMG_20140616_182108

আসলে এর বর্ননা কি দেবো। ছবি দিচ্ছি – অনেক ছবি। দেখে নিন। যারা যান নি, ঘ্রানেই অর্ধ ভোজন।

পথে একটা জায়গায় থেমে আসর নামাজ পড়ে নিলাম আমরা। রঙ চা খেলাম গ্রামের টং এর দোকান থেকে। উপভোগ করতে লাগলাম চারপাশের মনকাড়া দৃশ্য গুলো। দ্বিপের প্রধান যে পথ, তার ২ পাশেই পানি।

IMG_20140616_181652

এক পাশে আছে জল ডুব গাছে দের মেলা। দেখতে বেশ দারুন লাগে। ছবির মত। এমন আগে কখনো দেখিনি। আর অন্য পাশ টা সাগরের সাথে মিশেছে। তাই ওখানে পানি বেশী। তবে গভির নয়।  এই পানির ওপরেই মানুষ জন ঘর বেধেছে। বাউন্ডারিও আছে। প্রতিটা বসতি ও যেন এক একটি দ্বিপ।

IMG_20140616_182908

IMG_20140616_163329

প্রধান পথটি যেখানে বাক নিয়েছে, তার অন্য পাশেই পথ টি শেষ হয়েছে সাগরের সাথে মিলিত হয়ে। এক পাশে মোষেরা গা পানি তে ডুবিয়ে আছে, রাজ হাসের দল ঘুরছে। আর অন্য পাশে অনেক নৌকা – মাঝিরা মাছ ধরছে সাগরে।

পথের ২ পাশে সারি সারি গাছ পালা। নাম না জানা এই সব গাছে ধরে আছে হলুদ রঙ এর ফুল। এই পথ আমরা যাচ্ছি তো যাচ্ছি, শেষ হয় না…জানতাম, সব সুন্দর সীমিত (তাই এরা সুন্দর) কিন্তু এখানে সৌন্দর্য যেন অসীম এর সাথে মিতালি করেছে। জান্নাতের পরিবেশ যেন চারপাশ। যতই বলা হোক, এর সঠিক রুপ বর্ননা অন্তত আমার পক্ষে সম্ভব নয়।

IMG_20140616_170617

IMG_20140616_161805

পথে যেতে যেতে চোখ পড়ে গেলো সারি সারি নারকেল গাছে ধরা থাকা ডাব গুলো। নিঝুম দ্বিপ এ ও খেয়েছিলাম। ভাবলাম, এখানেও খাওয়া যাক। একটা ছেলে কে বলতেই বলল আসেন। বলে পথ দেখালো তার ঘরের। বাইক ঢুকিয়ে দিলাম। ব্যাস। ডাব পাড়া হলো। আমরা ২ টি করে খেলাম।

IMG_20140616_171529

এবার হরিন  দেখার পালা। হ্যাঁ। এখানেও হরিন আছে। প্রথমে খবর নিয়ে চলে গেলাম “কলোনি” তে। ওখানে বাইক রাখতেই স্থানীয় একটি ছেলে হরিন দেখতে চাই শুনে হেসে বলল,  আসেন। একটু সামনে জেতেই খালের ওপারে জঙ্গলে দেখতে পেলাম হরিনের পাল নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়াচ্ছে। খাল পার হয়ে কেউ যাওয়ার চেস্টা করলেই ওরা অন্য দিকে পালিয়ে যাবে।

IMG_20140616_174805

IMG_20140616_174915

যতদূর সম্ভব ছবি তোলা হল। ভিডিও করা হল। তবে দুঃখের বেপারঃ ওনার DSLR ছিলো না, আর আমার ক্যামেরার চার্জ ও শেষ।

সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। ফিরে এলাম। রেস্ট নিলাম। রাতে খেতে বের হলাম। যদিও আলতাফ হোটেল নেই, তবে বেশ লাগলো খাবার। খরচ ও কম।

সকালে আমরা চলে যাবো। সাড়ে সাতটায় ঊঠে পড়লাম। ট্রলার ছাড়বে ১০ টায়।  নাসতা করতেই বাইক এর মালিক আলাউদ্দিন ভাই চলে এলো। তিনি নিয়ে গেলেন “ঘের” দেখতে। এখানে এক লোক ৪/৫ কিলো জায়গা লিজ নিয়ে সাজিয়েছে – মাছের চাষ ও করে। বেশ জায়গাটা। ওখান থেকে বাইক করে ঘাটে চলে এলাম। আলাউদ্দিন ভাই কে দিলাম ৬০০ টাকা। বেশ হেল্প করেছেন আমাদের বাইক দিয়ে এবং অন্যান্য সহোজগিতা করে।

অপেক্ষার পালা শেষে সাড়ে ১১ টায় ট্রালার ছাড়লো। ১০ মিনিট এর মাথায় নামলো বৃষ্টি। আমার দারুন ভালো লাগলো। জাকির ভাই ট্রলার এর অন্য পাশে (যেখানে সব মহিলারা) ওখানে গিয়ে তেরপল এর নিচে ঢুকে পড়লেন। ওনার খালি পা দেখা যাচ্ছিলো।

আরো কিছু পরে উপকুলের তীরে ভীষণ বড় বড় আছড়ে পড়তে লাগলো ট্রলার এ। দুলতে লাগলো কাগজের নউকার মত। মহিলারা ভীষণ দুলুনিতে চিৎকার শুরু করলো। আমিও কিছু টা ভয় পেয়েছিলাম এই ভীষণ দুলুনিতে। তীরে এসে কি তবে তরি ডুবে যাবে, কবি যেমন বলেছেন?

নাহ। কবির মুখে ছাই মেরে ট্রলার পৌঁছে গেলো। সেখানে আরেক কাহিনি। জোয়ার এর পানি কম থাকায় ট্রলার আটকে রইলো। হায় মাত্র ১০০ ফিট দুরে তীর। কিন্তু আটকে আছি।  মাঝি আসশ্ত করলো। ২ ঘন্টা হোক আর ৩ ঘন্টা – পারে ঠিক ই ট্রলার যাবে। শুনে মুখ আরো শুকিয়ে গেলো। তবে ৩০ মিনিট এর চেস্টায় ট্রলার ভিড়লো। জাকির ভাই নামেন নি। ওনার জুতা ভিজে যাবে। আরো ৩০ মিনিট পর তিনি এসে বিজয়ীর হাসি দিলেন। জুতা ভিজে নি।

অন্য রকম কিছু সময় কাটালাম…অদ্ভুদ কিছু সময়…

এখানে জলডুব গাছেরা লোনা পানির সাথে চির মিতালি করে পাখিদের জানায় আমন্ত্রণ…

নিস্তব্ধ বনে মিস্টি এক লহরির মত সুরেলা বেজে চলে কোকিলের কুহু, সাথে তাল মিলায় নাম না জানা আরো কত কত পাখিরা…

হঠাৎ বনের ভেতর কোন প্রানি চমকে ওঠে হরিণের তিব্র ডাক শুনে…

পথের দুপাশেই পানিতে দাঁড়িয়ে থাকা মাথা উচু গাছ গাছালি, আকাশ ময় তারা। গভীর বন থেকে ভেসে আসে হরিণের “কাউ” “কাউ” ডাক আর পেচার কিচর-কিচর, কিচর – কিচর ডাক সেই গভীর বেঞ্জনাময় অন্ধকার রাত কে এক অদ্ভুদ ভৌতিক মহিমায় ভরে দেয়…

অদ্ভুদ এক নেশায় মাতাল হয়ে গিয়েছিলাম আমি…আমরা…

এখন ফিরে এসে শান্তি নেই…আবার যেতে হবে…

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

Join 262 other followers

Contact Info

Email: black_guiter@hotmail.com Skype: hassan.tanvir1
copyright @ hassantanvir.wordpress.com 2015
%d bloggers like this: